শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৫:৪৮ পূর্বাহ্ন
‘আমার ছয় মেয়ে এক ছেলে। বড় ৫ মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, ছোট মেয়ে প্রতিবন্ধী। একমাত্র ছোট ছেলে ও প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ করে ও ভিক্ষা করে কোন রকমে বেঁচে আছি।’
কথাগুলো বলেন, ‘নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের নমির উদ্দিনের স্ত্রী ফজিলা বেগম।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারিভাবে আমার প্রতিবন্ধী মেয়ে নমিজা আক্তারের নামে প্রতিবন্ধী ভাতা হলেও এখন পর্যন্ত বই কিংবা ভাতার টাকা কোনটিই পায়নি।’ উপজেলা সমাজসেবা অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাহাগিলি ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় ৩১ নম্বর সিরিয়ালে নমিজা আক্তারের নাম রয়েছে। তার ভাতা বহি নম্বর-২৮৫৪। বাহাগিলি ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডে এরকম ভাতাভোগী সেকেন্দার আলীর সিরিয়াল নম্বর ৩২, ভাতা বহি নম্বর-২৮৫৫ এবং ফেরজুল মিয়ার সিরিয়াল নম্বর ২৯ ও ভাতা বহি নম্বর-২৮৫২। তাদের প্রতিবন্ধী ভাতার টাকাতো দূরের কথা এখনও ভাতার বইও হাতে পাননি তারা। ওই ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্যের স্বামী রবেল মিয়া তাদের সই জাল করে সমাজসেবা অফিসের লোকজন এবং ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশে ভাতার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ১ হাজার ৫৪০ জন প্রতিবন্ধীকে সরকার প্রদত্ত প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর আওতায় আনা হয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে প্রত্যেক ভাতাভোগী ৭৫০ টাকা মাসিক হারে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরের ভাতা বাবদ মোট ৯ হাজার করে টাকা পাবে। কিন্তু স্ব স্ব ইউনিয়ন জনপ্রতিনিধিগণ সমাজসেবা অফিস এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে যোগসাজশ করে ভাতাভোগীদের না জানিয়ে ব্যাংক থেকে ভাতার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন। গত শনিবার ও রবিবার উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের গিয়ে ভাতাভোগীদের সাথে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে। চাঁদখানা ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুস সালামের ছেলে আবু বক্কর সিদ্দিক, ভাতা বহি নম্বর-৩০৬৪; হাসানুর রহমানের প্রতিবন্ধী মেয়ে রেশমি আক্তার, বই নম্বর-৩০৬৫; ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ওহেদ আলীর মেয়ে চম্পা বেগম, ভাতা বহি নম্বর-৩১০৮; ২ নম্বর ওয়ার্ডের নুর ইসলাম, বই নম্বর-৩০৭২। তারা সকলেই বলেন, ‘স্থানীয় ইউপি সদস্যরা তাদের ভাতার টাকা উত্তোলন করে নিয়েছেন।’ এছাড়াও চাঁদখানা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অহেদ আলীর মেয়ে প্রতিবন্ধী মোছা. চাম্পা (ভাতা বই নম্বর-৩১০৮) বলেন, ‘চাঁদখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজার রহমানের ছেলে সানটু ভাতা উত্তোলন করে ৫ হাজার টাকা নিয়ে আমাকে ৪ হাজার টাকা দিয়েছেন।’ এছাড়াও কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আশরাফুল মিয়ার মেয়ে বিউটি বেগম, খবির হোসেন, মাগুড়া ইউনিয়নের জুমামপাড়া গ্রামের সেকেন্দা আলী, ছকমাল মিয়ার ছেলে জিল্লুর রহমানসহ শতাধিক প্রতিবন্ধীর টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাহাগিলি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান শাহ দুলু বলেন, ‘যদি কোন ইউপি সদস্য কিংবা সংরক্ষিত মহিলা সদস্য প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করে থাকে তাহলে অবশ্যই তাদেরকে ভাতার টাকা ফেরত দিতে হবে। কোনভাবেই প্রতিবন্ধীর টাকা আত্মসাৎ করতে দেওয়া হবেনা।’ চাঁদখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাফিজার রহমান বলেন,‘আমার ইউনিয়নে কোন প্রতিবন্ধীর কাছ থেকে একটি টাকাও গ্রহণ করা হয়নি। কেউ এ ধরনের প্রমাণ দিতে পারবে না। আপনারা প্রত্রিকায় নিউজ করেন।’ কৃষি ব্যাংক ম্যানেজার আফজালুল হক চৌধুরীর সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক থেকে সরাসরি ভাতাভোগীদের হাতে ভাতার টাকা দেওয়া হয়েছে।’ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা( অতিরিক্ত দায়িত্ব) ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘প্রতিবন্ধীর ভাতার টাকা যদি কেউ আত্মসাৎ করে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইননানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোকসানা বেগম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাকে কেউ কোন লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’