শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:০১ অপরাহ্ন
মিজানুর রহমান আজহারীর ওয়াজ মাহফিলে ধর্মান্তরিত সেই পরিবারটির সবাইকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পরিবারটিকে ধর্মান্তরিত করার এই ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২৪ জানুয়ারি লক্ষীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া গ্রামে। একই পরিবারের ১২ সদস্য একসঙ্গে ইসলামে দীক্ষা নেওয়ার পর এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। আলোচিত পরিবারটি এসেছিল ভারত থেকে। সেখানে হিন্দু ধর্মের অনুসারী ছিলেন পরিবারটির সদস্যরা।
বিতর্কের একপর্যায়ে বাংলাদেশের পুলিশ ওই পরিবারের ১২ জনকেই আটক করে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তবে পুলিশ বলছে, ভারতীয় নাগরিক হিসেবে যে ভিসা নিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে ঢুকেছিলেন তার মেয়াদ শেষ হয়েছে, এ কারণেই তাদেরকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
যা ঘটেছিল লক্ষ্মীপুরে
লক্ষীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার পানপাড়া গ্রামে ২৪ জানুয়ারির মাহফিলটির আয়োজন করে স্থানীয় মসজিদ কমিটি। সেখানে ওয়াজ করেন মিজানুর রহমান আজহারী। বাংলাদেশে এখন আলোচিত ধর্মীয় বক্তা তিনি। একইসঙ্গে তাঁকে নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। প্রচুর লোকসমাগম হয় তাঁর মাহফিলে।
ঘটনার দিন আজহারীর উপস্থিতিতে একটি পরিবারের ১২ সদস্যের সবাই ইসলামে দীক্ষা নেন। এর আগেও মিজানুর রহমান আজহারীর মাহফিলে ধর্মান্তকরণের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক বিতর্ক চলছে তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে।
তবে লক্ষীপুরের ঘটনাটির ব্যাপারে পুলিশ কিছু অনুসন্ধান চালিয়ে বলছে, এই পরিবারটি বাংলাদেশি নয়, এসেছে ভারত থেকে। আর ওয়াজ মাহফিলের আয়োজকরা বলছেন, পরিবারটির সদস্যরা ভারতীয় নাগরিক, সেটি তাদের জানা ছিল না।
পরিবারটির পরিচয়
১২ সদস্যের ধর্মান্তরিত পরিবারটির প্রধান হলেন মনির হোসেন। এর আগে ভারতে শংকর অধিকারী নামে পরিচিত ছিলেন তিনি। পুলিশ জানায়, গত বছরের আগস্ট মাসে দুই মাসের ভিসা নিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে এসেছিলেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাঁরা অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন।
লক্ষীপুর জেলার পুলিশ সুপার এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, ধর্মান্তরের ঘটনার পর তদন্ত করে পরিবারটির কর্তাব্যক্তি সম্পর্কে তাঁরা বিভিন্ন তথ্য জানতে পারেন। তিনি বলেন, ‘পরিবারটির কর্তা বাংলাদেশ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নাম মনির হোসেন। তাঁদের পরিবারের ভাষ্য, তিনি ছোটবেলায় হারিয়ে যান। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি কীভাবে ভারতে গেছেন- তা তাঁর জানা নেই। ভারতে হিন্দু পরিবারে বড় হয়েছেন এবং হিন্দু নারী বিয়ে করে সংসার করছিলেন। তিনি ভারতে নাম নিয়েছিলেন শংকর অধিকারী।
পুলিশ সুপার আরো বলেন, ‘এই ব্যক্তির দুই স্ত্রী এবং দুই ঘরে সন্তান সংখ্যা আট। একজন নাতিও রয়েছেন। তাদের সবাইকে আমরা পাই ভারতীয় পাসপোর্টসহ। বেনাপোল বন্দর দিয়ে তাঁরা বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেদিক দিয়েই তাঁরা আবার ফেরত গেছেন।’
মনির হোসেন বা শংকর অধিকারীর মা ফাতেমা বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় লক্ষীপুরের রামগঞ্জের চণ্ডীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তিনি।
ফাতেমা বেগম বলেন, ঘটনাটি ছিল নাটকীয়। তাঁর ছেলে হারিয়ে যাওয়ার ২৫ বছর পর তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ হয় গত বছরের জুলাই মাসে। সে সময় শুধু গ্রামের নামে বা ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠিয়েছিল মোবাইল নম্বর দিয়ে। একজন পোস্টমাস্টারের চেষ্টায় সেই নম্বরের মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ হয়। এরপর তার ছেলে পরিবার নিয়ে গত বছরের আগস্টে দেশে আসে।
ফাতেমা বেগম জানান, তাঁর ছেলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে বাংলাদেশেই থাকতে চেয়েছিল। তবে মাহফিলে তাঁর ছেলে কীভাবে ধর্মান্তরিত হয়েছে তা তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে দুই বউসহ সন্তানদের নিয়ে আসার পর তারা হিন্দু হয়। আমি তাদেরকে অন্য এলাকায় থাকতে বলেছিলাম। তারা কেরানীগঞ্জে বসবাস করছিল ছয়-সাত মাস ধরে। তারা মক্তবে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল এবং এরপর তাদের ওই মাহফিলে নিয়া কালিমা পড়ায়।’
ধর্মান্তকরণ নিয়ে বিতর্ক
পরিবারটিকে ধর্মান্তরিত করার ক্ষেত্রে জোর করা হয়েছে কি-না বা এটি সাজানো ঘটনা ছিল কিনা–এসব নানা প্রশ্ন অনেকে তুলেছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।
তবে মাহফিলে আয়োজকদের অন্যতম একজন মোহাম্মদ উল্লাহ দাবি করেছেন, পরিবারটিকে ধর্মান্তরিত করার ক্ষেত্রে তারা জোর করেননি। তাদের নাগরিকত্বের ব্যাপারেও জানা ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘পরিবারটির কর্তা মাহফিলের একদিন আগে আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছিল। এরপর মাহফিলের দিন তারা এফিডেভিট এর কপি সহ আইনজীবী নিয়ে এসেছিলেন।তাদের আইনজীবী ধর্মান্তরিত হওয়া সর্ম্পকিত সেই এফিডেভিট মাহফিলে পড়ে শোনান।’
মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘তাঁরা মিজানুর রহমান আজহারীর কাছে ধর্মান্তরিত হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আজহারী সাহেবকে যখন আমরা প্রস্তাব দেই, তখন উনি অপারগতা প্রকাশ করেন। কারণ কিছুদিন আগেও এরকম একজন বোন ধর্মন্তরিত হয়েছিলেন এবং তা নিয়ে আজহারী সাহেবের বিরুদ্ধে অপপ্রচার হয়েছিল। সেজন্য আমরা মঞ্চে থাকা আরেকজন আলমকে দিয়ে ঐ পরিবারকে কালিমা পড়ানো হয়েছিলো।’
পুলিশ সুপার এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘কেউ তাঁদেরকে জোর করে ধর্মান্তরিত করেছে- এমনটি আমরা পাইনি। কেউ বাধ্য করলে তখন আমরা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারতাম। এখানে তাঁদের ধর্মান্তরিত হওয়া না হওয়া আমাদের কাছে বিষয় ছিল না। আমাদের বিষয় ছিল, তাঁরা ভারতীয় নাগরিক হয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ছিলেন।’
সূত্র : বিবিসি বাংলা